বাবার মুখে ছেলে মাশরাফির গল্প

mashrafi

বাবার মুখে ছেলে মাশরাফির গল্প

বাংলাদেশের খেলা দেখতে এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাশরাফি বিন মুর্তজার বাবা গোলাম মুর্তজা। সিডনি থেকে বিমানে পরবর্তী ম্যাচের ভেন্যু অ্যাডিলেইড যাওয়ার পথে তিনি শোনালেন ছেলের ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ হয়ে ওঠার গল্প।

গত বৃহস্পতিবার নেলসনে বাংলাদেশের বিপেক্ষ স্কটল্যান্ড ৩১৮ রান করার পরই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন গোলাম মুর্তজা। ম্যাচের এক পর্যায়ে চিন্তায় অসুস্থ হন তিনি। তবে বাংলাদেশ স্বচ্ছন্দে জয় পাওয়ার পর আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

রানের এই পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশের জয়টাকে মুর্তজা দেখছেন দলের পাল্টে যাওয়া হিসেবে। মানসিকভাবে বাংলাদেশ দল আগের চেয়ে অনেক পরিণত হয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের দলের বদলে যাওয়া প্রসঙ্গের পথ ধরেই আসে ছোট্ট মাশরাফির বেড়ে ওঠার গল্প। আসে শান্ত নড়াইলের এক স্কুলের ‘ভালো’ ছাত্রের অসাধারণ ক্রিকেটার হওয়া আর মাঝের ২২ গজে গতির ঝড় তোলার জন্য নড়াইল এক্সপ্রেস হয়ে ওঠার কাহিনী।

এমনিতেই ছেলে দলের অধিনায়ক, প্রিয় দলের সমর্থনে বিশ্বকাপের এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই বাবা। শনিবার ভার্জিন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে বসে মাশরাফিকে নিয়ে অনেক স্মৃতিই মনে পড়ল গোলাম মুর্তজার। সেই গল্প বলে গেলেন তিনি।
নানা বাড়িতে জন্ম মাশরাফির। বড়ও হয়েছেন নানা বাড়িতেই। মাশরাফির নানির মনে হয়েছিল তার মেয়ে (মাশরাফির মা) নাতিকে ঠিকভাবে লালন-পালন করতে পারবেন না। নানা বাড়ি লাগোয়া প্রাইমারি স্কুলে পড়লেও এসএসসি-এইচএসসি পাশ করেছেন নড়াইল সরকারি স্কুল ও কলেজ থেকে।

গোলাম মুর্তজা জানান, পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন মাশরাফি। তার এসএসসি-এইচএসসির ফলও ভালো ছিল। এইচএসসি পাশ করার পর দর্শন শাস্ত্রে অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ততদিনে মাশরাফি পুরোদস্তুর ক্রিকেটার। বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ। নিজের সেই ভালোবাসার খেলাকে সময় দিতে গিয়ে পড়াশোনাটা আর শেষ করা হয়নি মাশরাফির।

তার বাবা গোলাম মর্তুজা ছিলেন অ্যাথলেট। ক্রিকেট মোটেই ভালো লাগত না তার। কলেজ জীবনে হোস্টেলে তার রুমমেটরা ক্রিকেট খেলতেন। ক্রিকেটের বল-ব্যাট বাক্সে ভরে রাখতেন তারা। আর গোলাম মর্তুজা দুষ্টুমি করে সেই বাক্স মাঝেমধ্যেই রুমের বাইরে ফেলে দিতেন! সেই ক্রিকেট-বিদ্বেষী গোলাম মুর্তজার ছেলে মাশরাফির ক্রিকেটর সঙ্গে সখ্যতা কী করে হলো?

গোলাম মর্তুজা জানান, ছেলেবেলায় স্কুলের মাঠে বড়দের ক্রিকেট খেলতে দেখে মাশরাফি খেলাটিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তবে ফাস্ট বোলার বা মারকুটে ব্যাটসম্যান নয়, উইকেটরক্ষক হতে চাইতেন মাশরাফি।

উইকেটরক্ষকের হাতে গ্লাভস থাকে। মাশরাফির তো আর গ্লাভস ছিল না। দু’হাতে দুটি চপ্পল নিয়ে উইকেটরক্ষকের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন তিনি। বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারতেন না। বড়রা তাকে সরিয়ে দিত, আর মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতেন তিনি।

যার ক্রিকেট নিয়ে এত আগ্রহ, তাকে কি আর আটকে রাখা যায়? কোনো বাধাই মাশরাফিকে আটকে রাখতে পারেনি। স্কুলের ক্রিকেট, নড়াইলের ক্রিকেট ঘুরে তিনি পৌঁছে যান বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৯ দলে। ততদিনে মাশরাফি আর উইকেটরক্ষক নন, হয়ে গেছেন পেস বোলার।

ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে মাশরাফির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। ভালো বল করেন তিনি। এরপর প্রথম সফরে যান নিউ জিল্যান্ডে। তরুণ মাশরাফি সেখানে গতির ঝড় তোলেন। এরপরই তার নাম হয়ে যায় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’।

বাবা গোলাম মুর্তজার কাছে ক্রিকেটার মাশরাফি নন, মানুষ মাশরাফিই আগে জায়গা পায়। বাবার কাছে তার কৌশিক সাদা মনের আমুদে এক ছেলে।

নানা বিষয়ে বাবার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় ছেলের। ক্রিকেট নিয়ে তেমন কথা হয় না।

মাশরাফির বাবা এমনিতে একটু ঘরকুনো প্রকৃতির মানুষ। এই কারণেই ছেলে এত বছর ধরে ক্রিকেট খেললেও এর আগে কখনো তার খেলা দেখতে দেশের বাইরে যাননি।

কী আশা নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছেন গোলাম মুর্তজা? এই প্রশ্নের উত্তরে মাশরাফির বাবা তার স্বপ্নের কথা বলেন।

“আফগানিস্তান-স্কটল্যান্ডের পাশাপাশি আশা ছিল দল শ্রীলঙ্কা-ইংল্যান্ডকেও হারাবে। এর মাঝে আমরা শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গেছি। বাকি আছে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলা।”

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযানে বাংলাদেশে তাদের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি খেলবে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে। ম্যাচটি হবে নিউ জিল্যান্ডের হ্যামিল্টনে। ম্যাচটি কি দেখতে যাবেন গোলাম মুর্তজা?

আপাতত তিনি আগামী সোমবার অ্যাডিলেইডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়েই ভাবছেন। এই ম্যাচ জিতলেই মাশরাফিরা উঠে যাবেন নকআউটে। গোলাম মুর্তজার চোখ সেই সীমানা দেখছে।

মাশরাফির বাবার মতোই পুরো বাংলাদেশের মানুষের চোখেই গ্রুপ পর্বের সীমানা পেরিয়ে ভাসছে শেষ আটের মঞ্চ। সোমবারের অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ দল।

Comments
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •